গ্যাসের চুলার দারুন বিকল্প ইনডাকশন কুকার – কি, কেন ব্যবহার করবেন, সুবিধা-অসুবিধা?

বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা যত বাড়ছে, গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে সমানতালে। বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ পাওয়াও দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর গ্যাস সংযোগ থাকলেও গ্যাস না থাকার অভিযোগ তো অনেক পুরোনো। এর উপর যোগ হয়েছে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগের খরচ বৃদ্ধির চাপ। সবকিছু মিলিয়ে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা এখন যেন সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই তৈরি করছে বেশি।

গ্যাসের চুলার বিকল্প আগেও অনেক ছিলো। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের দিয়েছে আরো সহজ, আরো জ্বালানী সাশ্রয়ী এমন কিছু বিকল্প যা সত্যিই অবাক করার মতো। এমনই একটি সহজ কিন্তু কিছুটা অদ্ভুত বিকল্পই হচ্ছে ইনডাকশন কুকার।

ইনডাকশন কুকার কি?

চট করে দেখলে, ইনডাকশন কুকার আর ইনফ্রারেড কুকারের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। তবে দেখতে কাছাকাছি হলেও ইনফ্রারেড কুকারের চেয়ে ইনডাকশন কুকার অনেক জ্বালানি সাশ্রয়ী। ইনডাকশন কুকার তড়িৎচৌম্বকীয় বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের মাধ্যমে রান্না করার পাত্রকে ব্যবহার করে তাপ উৎপন্ন করে। তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করার জন্য ইনডাকশন কুকার অনেক জ্বালানি সাশ্রয়ী। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে এ কুকারে তুলনামূলক দ্রুত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ছবি কৃতজ্ঞতা : Nathan J Hilton

অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্য সাধারণ চুলায় যে কাজগুলো করতে বেশ সময় লাগে; যেমন : পানি গরম করা যায় অনেক দ্রুত। এটা পরীক্ষিত সত্য যে, সাধারণ গ্যাসের চুলার চাইতে ইনডাকশন কুকারে পানি ফোটাতে সময় লাগে অর্ধেকেরও কম। বিশ্বাস না হলে দেখে নিন এই ভিডিওটি

ইনডাকশন কুকার কিভাবে কাজ করে?

ইনডাকশন কুকারকে বাংলাদেশে অনেকে ম্যাজিক কুকারও বলে। আসলে ইনডাকশন কুকারে রান্না করার পদ্ধতি বেশ অভিনবও বটে। আমরা সাধারণত যে ধরণের গ্যাস বা ইলেকট্রিক চুলা দেখে অভ্যস্ত সেগুলোতে আগুন জ্বলা বা ইলেকট্রিক কয়েল গরম হবার সেই তাপ পাত্রকে গরম করে এবং পাত্র থেকে তাপ খাবারে পৌঁছে খাবার রান্না হয়। অন্যদিকে ইনডাকশন কুকার তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে খাবারকে বিশেষ পদ্ধতিতে গরম করে। লক্ষ্যণীয় যে, তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ পাত্রের অনুগুলোকে সরাসরি উত্তেজিত করে পাত্রকে গরম করে।

ইনডাকশন কুকারের সুবিধা

১। রান্না হয় দ্রুত : আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে আমাদের সাধারণ চুলার তুলনায় রান্নার পাত্রে তাপ পরিবহন হয় অনেক দ্রুততার সাথে। তাই সঠিক পাত্র ব্যবহার করলে ইনডাকশন কুকারে রান্না হয় অনেক দ্রুত।

২। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ : গ্যাসের চুলায় সঠিক তাপমাত্রা বোঝা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ইনডাকশন কুকারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ। সাধারণ চুলাগুলোতে চুলা বন্ধ করার পরও কিছু তাপমাত্রা রান্নার পাত্রে ও চুলায় থেকে যায়, যা খাবারকে অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রান্না করে ফেলে। কিন্তু ইনডাকশন কুকারে চুলা বন্ধ করার সাথে সাথেই তাপ পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবার কারণে রান্না কম-বেশি হবার সুযোগ নেই বললেই চলে।

৩। জ্বালানী সাশ্রয়ী : সাধারণ চুলাগুলোতে পুরো পাত্র ঠিকমতো গরম হয়ে গেলে রান্না শুরু হয়। এজন্য পুরো পাত্র গরম হতে অনেক তাপ ব্যবহার হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরো পাত্রের তাপ রান্নার জন্য ব্যবহার না হয় এমনিতেই বাতাসে মিশে যায় যা আমাদের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে অপ্রয়োজনীয়ভাবেই। অন্যদিকে, সঠিক পাত্রে ইনডাকশন কুকারে রান্না করলে শুধুমাত্র পাত্রে নিচের অংশ গরম হয় তাই তাপ নষ্ট হয় না। আপনার রান্না হয় অনেক জ্বালানী সাশ্রয়ী।

৪। তুলনামূলক নিরাপদ রান্না : এ পদ্ধতিতে রান্নায় শুধুমাত্র রান্নার পাত্রই কিছুটা গরম হয়, সেজন্য হাতে গরম কোনোকিছুর ছোয়া লাগার সম্ভাবনা কমে আসে অনেকাংশে। আপনি রান্না হবার পর যখনি পাত্র চুলার উপর থেকে সরিয়ে নেবেন তখনই খাবার গরম করার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে, তাই ভুলে চুলা জ্বালিয়ে রাখার কারণে বিপদ ঘটার সম্ভাবনাও কমে আসে অনেকটুকু।

এর পাশাপাশি যেহেতু এ ধরণের চুলায় গ্যাসের চুলার মতো গ্যাস বের হবার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই সেদিক থেকেও নিরাপত্তা বাড়ে বেশ খানিকটা।

৫। গরম কম লাগে : গ্যাসের চুলায় রান্না করলে আগুনের তাপ রান্নার পাত্রে লাগার পাশাপাশি আশেপাশের পরিবেশকেও গরম করে ফেলে। তাই রান্নাঘরের পরিবেশ হয়ে ওঠে অনেক গরম। কিন্তু ইনডাকশন কুকারে এভাবে আগুন ব্যবহার হয় না তাই মূলত শুধুমাত্র পাত্রের তলাটুকুই গরম হয় তাই তাপ চারিদিকে ছড়িয়ে যাবার সেরকম কোনো সুযোগ পায় না। সব মিলিয়ে পরিবেশ থাকে ঠান্ডা।

ইনডাকশন কুকারের অসুবিধা

১। দাম কিছুটা বেশি : রান্নাবান্নার অন্যান্য প্রযুক্তিগুলোর তুলনায় ইনডাকশন কুকারের প্রযুক্তি কিছুটা নতুন হবার কারণে এর দামও সাধারণ চুলার তুলনায় কিছুটা বেশি। কিন্তু আপনার বাসাবাড়ি বা রেস্টুরেন্টের জন্য ইনডাকশন কুকার কেনাকে একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে পারেন। কারণ এর মাধ্যমে আপনার যে পরিমান বিদ্যুৎ বিল, ঝামেলা আর সময় বাঁচবে তাতে অতিরিক্ত খরচটুকু উঠে আসবে কিছুদিনের মধ্যেই। তবে আমরা আশা করি, যত বেশি মানুষ ইনডাকশন কুকার ব্যবহার করবে এর দাম ততই কমবে।

২। রান্নার জন্য আলাদা পাত্র প্রয়োজন : প্রায় সময়ই দেখা যায় যে, বাংলাদেশে প্রচলিত রান্নার হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে ইনডাকশন কুকারে রান্না করা যায় না। এটা আমাদের দেশের বেলায় ইনডাকশন কুকারে রান্নার ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা। যেসব পাত্রের নিচের অংশ সমান এমন ধরণের সব পাত্রেই ইনডাকশন কুকারে রান্না করা যাবে এমন ধারণা ভুল।

যেসব পাত্রে লোহার কণা থাকবে সেসব পাত্র আপনি ব্যবহার করতে পারেন ইনডাকশন কুকারে রান্নার জন্য। কোন পাত্র ইনডাকশন কুকারের জন্য উপযুক্ত সেটা বুঝতে আপনি “চুম্বক পরীক্ষা” করতে পারেন। যদি কোন চুম্বক পাত্রের তলায় লেগে যায় তাহলে ঐ পাত্র ইনডাকশন কুকারের জন্য উপযুক্ত বলে ধরে নিতে পারেন। 

৩। প্রথমে শিখতে সময় লাগে : আমাদের দেশে এখনো অনেকেই সুইচ টিপে রান্নার বিষয়টাকে খুব দ্রুত শিখতে পারে না। এর পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে যাতে আপনার রান্নার পাত্রটি ইনডাকশন কুকারের একেবারে মাঝামাঝি যে গোল দাগ দেয়া থাকে সে দাগের মধ্যেই থাকে। নতুবা অনেক সময় পাত্র ঠিকমতো গরম হয় না ফলে রান্না হয়ে সমস্যা হয়।

৪। কাঁচে দাগ পড়তে পারে : ইনডাকশন কুকারের উপরের অংশটি বেশ মসৃণ কিন্তু শক্ত গ্লাস দিয়ে বানানো হয়। এ ধরণের গ্লাসে সহজে দাগ পড়ে না। কিন্তু যত্নসহকারে ব্যবহার না করলে বিশেষ করে ধাতব ছুরি কাঁচি থেকে সাবধানে না রাখলে এই গ্লাসের উপরেও দাগ পড়তে পারে। এজন্য কুকারের ব্যবহারবিধিতে পরিস্কার ও যতটা সম্ভব মসৃণ তলাসহ পাত্র ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

কিছু জিজ্ঞাসা ও তাদের উত্তর

প্রশ্ন ১। ইনডাকশন কুকার কি নিরাপদ? : হ্যা, এক কথায় বলা যায় ইনডাকশন কুকার নিরাপদ। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, রান্না চলাকালীন ইনডাকশন কুকারের উপরের কাঁচ গরম হয়ে যায় না, তাই হাতে গরম ছ্যাকা লাগার সম্ভাবনাও কমে আসে অনেকটুকু। আর শুধুমাত্র পাত্র গরম হবার কারণে তাপ বাতাসে ছড়িয়ে যায় না। সেজন্য এ চুলায় রান্না করলে আপনার রান্নাঘরও থাকবে তুলনামূলক ঠান্ডা। আবার কিছু ইনডাকশন কুকারে পাত্র সরিয়ে ফেলার সাথে সাথেই চুলা বন্ধ হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই, এ ধরণের সুবিধাও বিপদের মাত্রা কমিয়ে আনে কিছুটা হলেও।

তবে ইনডাকশন কুকারে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার হয় বলে যেসব ব্যক্তির পেসমেকার লাগানো আছে তাদের এ চুলায় রান্না না করাই ভালো।

প্রশ্ন ২। ইনডাকশন কুকারে রান্না করতে কি আলাদা পাত্র প্রয়োজন? : বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ সময়ই, হ্যা। কারণ আমাদের দেশে যে গোল তলানিযুক্ত সাধারণ পাতিলগুলোতে রান্না করা সেগুলোতে প্রায়ই চুম্বক ধরে না। আর যে পাত্রে চুম্বক ধরে না সেগুলো দিয়ে ইনডাকশন কুকারে রান্না করাও সম্ভব না।

প্রশ্ন ৩। কিভাবে বুঝবো কোন পাত্রে ইনডাকশন কুকারে রান্না করা যাবে? : এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ, যে পাত্রে চুম্বক আকর্ষিত হবে সে পাত্রেই আপনি ইনডাকশন কুকার ব্যবহার করে রান্না করতে পারবেন।

প্রশ্ন ৪। ইনডাকশন কুকারে কি যে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা যাবে? : হ্যা, আপনি আমাদের বাংলাদেশে যে কোনো জায়গায় সাধারণ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েই ইনডাকশন কুকার ব্যবহার করতে পারেন। তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখা উচিত আপনার চুলার বিদ্যুৎ সংযোগ যেন সহজে নড়ে না যায় এমন স্থানে লাগানো উচিত, নতুবা বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

আপনার সুবিধার জন্য আমরা বাংলাদেশে জনপ্রিয় এমন কিছু ইনডাকশন কুকারের নাম এখানে দিয়ে দিচ্ছি।

১। Vision induction cooker VSN 1206 Eco

২। VIGO induction cooker VGO 1601V Eco

৩। KIAM induction cooker K – 9010

৪। Vision induction cooker VSN 1201A Eco

৫। Miyako induction cooker TC – R3

ইনডাকশন কুকার নিয়ে আপনার আরো কোনো প্রশ্ন, পরামর্শ বা অভিজ্ঞতা জানাতে পারেন আমাদেরকে নিচের কমেন্ট সেকশনের মাধ্যমে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *