ঘরে থেকে সহজে কাজ করতে প্রয়োজনীয় ৪ ধরণের সফটওয়্যার / অ্যাপ্লিকেশন

ঘরে থেকে কাজ করার বিষয়টি খুব বেশি নতুন নয়। গত কয়েকবছর থেকেই ঘরে থেকে কাজ করার বিষয়টি অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত। ২০১৯ সাল পর্যন্ত মূলত তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া ঘরে থেকে কাজ করার বিষয়টির তেমন কোন প্রচলন ছিল না। কিন্তু ২০২০ সালে, কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই বাধ্য হয়ে কর্মীদের ঘরে থেকে কাজ করতে উৎসাহী করেছে।

আমরা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ২০২০ সালে ঘরে থেকে কাজ করা শুরু করলেও পশ্চিমা বিশ্বে আরো আগে থেকেই এই প্রচলন ছিল। এ কারণে ঘরে থেকে কাজ করার জন্য বেশ কিছু সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন আগে থেকেই ছিল। তাই আমরা বেশ সহজেই বাসায় বসে কাজ করার কথা ভাবতে পেরেছি নতুবা ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না।

হঠাৎ করে এ পরিস্থিতি তৈরি হবার জন্য আমরা অনেকেই ঘরে থেকে দক্ষভাবে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করার জন্য যে সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনগুলো আছে সেগুলো সম্পর্কে খুব একটা জানি না। এ ধরণের কিছু সফটওয়্যার নিয়ে আজ লিখছি। মজার বিষয় হচ্ছে, এ সফটওয়্যারগুলো এমন নয় যে, আপনি শুধু ঘরে থেকে কাজ করার ক্ষেত্রেই এ সফটওয়্যারগুলো আপনার প্রয়োজন হবে, বরং স্বাভাবিক সময়েও এ সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করে আপনি আপনার অনেক কাজই অনেক সহজে আর দক্ষভাবে করতে পারবেন। চলুন তবে একনজরে দেখে নেয়া যাক সফটওয়্যারগুলোকে।

গ্রুপ ভিডিও কল

ঘরে থেকে কাজ করতে চাইলে প্রথমেই প্রয়োজন হয়, একসাথে দলের সবার সাথে কথা বলা বা গ্রুপ মিটিংয়ের। এ মূহুর্তে “জুম” অ্যাপটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে গ্রুপ কল করার জন্য। এ অ্যাপটি খুব বেশি নতুন না হলেও, কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব শুরু হবার পর এর ব্যবহার এবং পরিচিতি দুটোই বেড়ে গিয়েছে অনেকগুণ। এই অ্যাপটি আপনি বিনামূল্যে বা কিনে ব্যবহার করতে পারেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই কিনে ব্যবহার করলে কিছু সুবিধা বেশি পাওয়া যাবে, বিনামূল্যে ব্যবহার করার চেয়ে। জুমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এর বিনামূল্যের সংস্করণেই ১০০ জন পর্যন্ত একবারে ভিডিও কলে সংযুক্ত হতে পারে। বিপরীতে সমস্যা হচ্ছে, দলগত বা গ্রুপ ভিডিও কলে ৪০ মিনিটের বেশি টানা কথা বলা যায় না। জুম অ্যাপটি ডাউনলোড করে ব্যবহার করার জন্য ভিজিট করতে পারেন জুমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে

জুম ছাড়াও কিন্তু ভালো কিছু ভিডিও কলিং অ্যাপ রয়েছে, যেগুলো দিয়েও ভিডিও কলিং এর কাজ ভালো ভাবেই করা যায়। এখানে খুবই জনপ্রিয় স্কাইপ অ্যাপটির কথা না বললেই নয়। যারা অনেক আগে থেকেই ভিডিও কলিং করে থাকেন তারা খুব ভালোভাবেই এ অ্যাপটির কথা জানেন। বলা যায়, ভিডিও কলের প্রচলনের একেবারে শুরুর দিকের একটি সফটওয়্যার ছিলো এ স্কাইপ। সম্প্রতি স্কাইপ দলগত ভিডিও কল করা আরো সহজ করেছে।

ল্যাপটপে স্কাইপ গ্রুপ ভিডিও কল

স্কাইপ-এ এখন দলগত ভিডিও কলে যুক্ত হবার জন্য এখন আর সফটওয়্যারটি ডাউনলোড করে ইন্সটল করারও প্রয়োজন নেই। সাধারণ একটি ওয়েব লিংকের মাধ্যমেই আপনি যুক্ত হতে পারেন যে কোন সময়, শুধুমাত্র গুগল ক্রোম বা মাইক্রোসফট এজ ব্রাউজার ব্যবহার করেই।

অনলাইন ফাইল আদান-প্রদান

স্বাভাবিক সময়ে অফিসে বড় ফাইল আদান প্রদান করা খুব সমস্যার কোন বিষয় না। সাধারণ পেনড্রাইভ বা USB Drive দিয়ে সহজেই কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। আবার মাঝারি থেকে বড় অফিসগুলো অধিকাংশ সময়েই নিজস্ব ফাইল শেয়ারিং সার্ভার ব্যবহার করে, নিজেদের মধ্যে ফাইল আদান-প্রদানের জন্য। কিন্তু বাসায় থেকে কাজ করার ক্ষেত্রে এ ধরণের সুবিধাগুলো পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এতে দমে যাবার কিছু নেই! এ ধরণের ফাইল আদান-প্রদানের জন্য খুবই ভালো কিছু সফটওয়্যার আছে যেগুলো দিয়ে আপনি আপনার অফিসের প্রতিদিনের কাজ করতে পারেন ঘরে বসেই। একবার বুঝে নিয়ে আপনার পিসিতে সবকিছু ঠিকঠাক করে দিলে অফিসে যেভাবে কাজ করতেন ঠিক সেভাবেই করতে পারবেন কোন ধরণের ঝামেলা ছাড়াই! এই সফটওয়্যারগুলোর আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে, এ সেবাগুলো ব্যবহার করে আপনার ফাইল রাখলে আপনার গুরত্বপূর্ণ ফাইল হারিয়ে যাবার সম্ভাবনাও কমে যায়।

ফাইল আদান-প্রদানের সফটওয়্যারের কথা বলতে গেলে প্রথমে ড্রপবক্স (Dropbox) এর কথা না বললে আমি মনে করি অবিচার হয়ে যাবে। অনলাইন ফাইল আদান-প্রদান করার জন্য বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য হচ্ছে ড্রপবক্স।আপনি যেকোন সময় আপনার ফ্রি অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন ড্রপবক্সের ওয়েবসাইটে গিয়ে এই লিংকের মাধ্যমে। অ্যাকাউন্ট খোলার সাথে সাথে প্রাথমিকভাবে আপনি পাবেন ২ গিগাবাইট অনলাইন স্পেস, যা কিনা আপনি পরবর্তীতে ১৬ গিগাবাইট পর্যন্ত বাড়িয়ে নিতে পারবেন বিনামূল্যেই! অধিকাংশ অফিসিয়াল কাজকর্মের ক্ষেত্রেই এই পরিমান অনলাইন স্পেসেই হয়ে যায়। আপনার আরো বেশি প্রয়োজন হলে কিনে নিতে পারেন আরো অনেকগুণ বেশি স্পেস।

ড্রপবক্স ছাড়াও এ ধরণের কাজের জন্য রয়েছে আরো অনেক সফটওয়্যার, যেমন : গুগল ড্রাইভ, পিক্লাউড, ওয়ানড্রাইভ, আইড্রাইভ, মেগা ক্লাউড স্টোরেজ ইত্যাদি। প্রত্যেকেরই রয়েছে কিছু সুবিধা-অসুবিধা। এগুলোর মধ্যে মেগা ক্লাউড আর পিক্লাউড কথা আলাদা করে বলা যায়। মেগা ক্লাউড আপনার অনলাইনে রাখা ফাইলের নিরাপত্তার জন্য বিখ্যাত। আর পিক্লাউড তুলনামূলক নতুন হলেও সুইস প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলনামূলক কম সময়ে ভালো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট

সবাই যার যার বাসায় থেকে কাজ করলে আরো একটি বিষয় সামনে আসে, আর সেটা হচ্ছে যে কোন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা। শুধু ভিডিও কল করে কিন্তু প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করা খুবই কঠিন ব্যাপার। কোন প্রজেক্টের বর্তমান অবস্থা একনজরে যে কোন সময় দেখে নেয়া, কে কোন কাজের দায়িত্ব পালন করছে কিংবা কার কাজের অগ্রগতি কতটুকু সেগুলো দেখার জন্য রয়েছে বিশেষায়িত কিছু সফটওয়্যার। গুছিয়ে ব্যবহার করলে এ সফটওয়্যারগুলো প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী। আপনি একবার এ সেবাগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে স্বাভাবিক সময়েও নিশ্চিতভাবেই সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করতে চাইবেন সেটা প্রায় নিশ্চিত।

এ ধরণেরই একটি সফটওয়্যার হচ্ছে ট্রেলো(Trello)। ট্রেলোতে আপনি প্রায় যে কোন আকারের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করতে পারেন। অনেক বড় প্রজেক্টকেও বেশ কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করে কাজ করা যায় এ সফটওয়্যারে। ট্রেলো দিয়ে ব্যবস্থাপনা করা কিছু প্রজেক্টের উদাহরণ দেখে নিতে পারেন এই লিংক থেকে।

ট্রেলো ছাড়াও রয়েছে আরো অনেক এ ধরণের সফটওয়্যার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেগুলো বিনামূল্যে ব্যবহার শুরু করা যায় না। তবে অনেকটা ট্রেলোর মতোই বিনামূল্যে ব্যবহার শুরু করতে পারেন ফ্রিডক্যাম্প– এ। অনেকের মতে ফ্রিডক্যাম্প ট্রেলোর চেয়েও ভালো সুবিধা দিয়ে থাকে, যদিও ট্রেলো ব্যবহার করতে বেশি আরামদায়ক।

বড় ফাইল পাঠানো

অনলাইনে কাজ করতে গেলে অনেক সময় আমাদের বড় ফাইল পাঠাতে হয়। জিমেইল, ইয়াহু মেইল বা হটমেইলসহ এ ধরণের মেইল সেবায় অ্যাটাচমেন্টে ৫০ মেগাবাইটের বেশি সাইজের ফাইল পাঠানো যায় না। অনেক সময়ই প্রেসে বড় বড় ফাইল যেমন : লোগো, বিজনেস কার্ড, ব্রোশিওর এর মূল ফাইল পাঠাতে হয়। এগুলোর আকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশ বড় হয়ে থাকে। আবার কাউকে চটপট কোন ভিডিও ফাইল পাঠাতেও এ ধরণের সেবা বেশ কার্যকর। শুধু ফাইল পাঠানোর এ সেবাগুলোর আরেকটি ভাল দিক হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর অনলাইনে থাকা আপনার ফাইলটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মুছে দেয়া হবে। যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে যে কেউ আপনার প্রতিষ্ঠানের গুরত্বপূর্ণ ফাইল ডাউনলোডও করতে পারে না।

ফাইল পাঠানোর এ সেবাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে উইট্রান্সফার। এ সেবাটিতে আপনি ২ গিগাবাইট পর্যন্ত আকারের ফাইল পাঠাতে পারেন বিনামূল্যে। এর জন্য শুধুমাত্র প্রয়োজন যাকে আপনি পাঠাতে চান তার মেইল ঠিকানা এবং আপনার মেইল ঠিকানা। পাঠানোর ঠিক ৭ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপনার ফাইলটি মুছে যাবে। যার কাছে ফাইল পাঠিয়েছেন তিনি ৭ দিনের মধ্যে যতবার খুশি ফাইলটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

উইট্রান্সফার ছাড়াও এ ধরণের সেবার জন্য রয়েছে ফায়ারফক্স সেন্ড। এটি সুপরিচিত ফায়ারফক্স ইন্টারনেট ব্রাউজারের একটি সেবা। ফায়ারফক্সের মতো এ সেবাতেও তারা নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরত্ব দিয়েছে। ফায়ারফক্স সেন্ড-এর মাধ্যমে আপনি ২.৫ জিবি পর্যন্ত আকারের ফাইল পাঠাতে পারবেন। এর ভালো একটি সুবিধা হচ্ছে আপনি নির্দিষ্ট করে দিতে পারবেন যে, আপনার ফাইলটি কতবার ডাউনলোড করা যাবে! ফায়ারপক্স সেন্ড ছাড়াও রয়েছে স্ম্যাশ এবং সেন্ড-এনিহয়্যার। এগুলোও বেশ আকর্ষনীয় কিছু সুবিধা দিয়ে থাকে।

উপরের সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করলে আপনার কাজ হয়ে উঠবে আরো সহজ আর উপভোগ্য। শুভেচ্ছা সবাইকে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *